একেই বলে শুটিং (সত্যজিৎ রায়)


 “একেই বলে শুটিং”। বইটা সত্যজিৎ রায়ের লেখা।এইমাত্র এটাকে পড়া শেষ করে ,ওখান থেকে তথ্য জোগাড় করে, খানিকটা ‘এখনত্ব’ আরোপ করে, স্বকীয় ভঙ্গিতে জ্ঞান দিতে আরম্ভ করছি। 

পথের পাঁচালী:

সত্যজিৎ তখন বিজ্ঞাপনের অফিসে কাজ করেন। সাথে সাথে হলিউডের সিনেমাগুলোও ভালভাবে আত্মস্থ করছেন।সিনেমা দেখতে তার খুব ভাল্লাগে। হটাৎ সিনেমা বানানোর ভূত মাথায় উপবিষ্ট হতেই শুরু হল পথের পাঁচালীর শুটিং। চাকরির ফাঁকে ফাঁকেই শুরু হল শুটিংয়ের কাজ।

উনিশ শতকের মধ্যিখানে ভারতের মত একটা সামাজিক শুচিবায়ুগ্রস্থ পোড়া দেশে ক্লাসিক সিনেমা বানানো যে কতটা কঠিন, তা বোঝা শক্ত নয়।

ছবি তৈরির সময় একগাদা ঝামেলা সামনে এসে ভৈরবনৃত্য শুরু করল। স্বাভাবিকভাবেই ছবির কাজ চলে বহুদিন ধরে। সমস্যা গুলো একে একে বলি।

প্রথমেই এল টাকার সমস্যা। এদেশে বটতলায় লম্বা জটা দুলিয়ে , কতক ঠাকুরের ছবি দেওয়ালে সেঁটে দিয়ে মুশকিল আসানের গ্যারেন্টি দিলেই লক্ষ্মীলাভ আটকায় কার সাধ্য? কিন্তু ভাল শিল্পের জন্য টাকা আদায় করতে গেলেই ‘শিল্পপ্রেমী বাঙালি’ কিছু ফ্রি অ্যাডভাইস দিয়ে সরে যাবে। সত্যজিতের ক্ষেত্রেও তাই হল। ওঁর পকেট এমনিতেই গড়ের মাঠ, তার মধ্যে আবার কাস্টিং এর সমস্যা। অপুর চরিত্রে কে অভিনয় করবে, সেই নিয়ে খুব রেলা চলল। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ এর ভাড়া ঘরে বিকেলের এক নির্দিষ্ট সময়ে মিটিং হত। শেষমেষ হাল ছেড়ে দেবার মত অবস্থা, এমন সময় সত্যজিতের স্ত্রী পাশের বাড়ির ছোট্ট ছেলেটাকে ডেকে পাঠালেন। তিনিই শ্রীমান সুবীর ব্যানার্জি...... পথের পাঁচালীর অপু। 

টাকা এবং কাস্টিং এর সমস্যা জনিত কারনে আড়াই বছর ধরে ছবির কাজ চলে। তাতে নানারকম হ্যাপা উপস্থিত হল। অপু দুর্গার বয়স বেড়ে গেল, যদিও ছবিতে তা ধরা পড়েনি। চুনিবালা দেবী ওরফে ইন্দিরা ঠাকুরণ এর বয়স প্রায় আশি..... ভাগ্যিস শুটিং এর ধকল সত্বেও আশি বছর বেঁচে ছিলেন....।

শুটিংয়ের শুরুতেই গোলমাল শুরু হল। বর্ধমানের পলিসিট নামক একটা জায়গায় কাশফুলের শট নেওয়া হবে। প্রথম দিন খানিকটা শুটিং হয়েছে, তারপর ছয়দিন অফিস করে সত্যজিত যখন ঐ জায়গায় আবার ফিরে এসছেন, দেখছেন সেখানে আর কাশফুল নেই, গরুতে খেয়ে নিয়েছে। পরের বছর শরৎকালে আবার সেই দৃশ্যের শট্ নেওয়া হয়।

 ভুলো নামের যে কুকুরকে একটা দৃশ্যের জন্য আনা হয়, সে আবার শুটিং চলাকালীন মারা যায়, তারপর একইরকম একটা কুকুর দিয়ে কাজ চালানো হয়। ফিল্ম দেখে ফাঁকি ধরে কার সাধ্য!

বৃষ্টির পারফেক্ট শট্ নেবার জন্যও দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছেন সত্যজিৎ। অবশেষে শরতের আকাশে মেঘ দেখা গেল, তুমুল বৃষ্টি নামল,তারপরই দুর্গার বিড়বিড়... “নেবু পাতায় করমচা, হে বৃষ্টি ধরে যা ... ”

শট্ নেবার পর ঠান্ডায় কম্পনরত ভাই-বোন কে দুধের সঙ্গে ব্র্যান্ডি মিশিয়ে খাইয়ে গরম করা হল।

এই পথের পাঁচালীর মাধ্যমেই তিল তিল করে গড়ে উঠেছিল পরিচালক সত্যজিৎ। প্রচুর বাধা থাকা সত্ত্বেও কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা অসামান্য। পথের পাঁচালীর মুক্তি ভারতীয় সংস্কৃতি সরণীর একটা মাইলস্টোন রচনা করেছে। 


গুপি গাইন বাঘা বাইন:

‘বাঘের খেলা’ নামক অধ্যায়ের শুরুতেই সত্যজিৎ স্বীকার করেছেন যে জন্তু-জানোয়ার নিয়ে ছবি তোলার ব্যাপারে হলিউডকে কেউ টেক্কা দিতে পারবে না। মুভিতে জন্তু-জানোয়ার ব্যবহার নিয়ে সত্যজিৎ মূলত জ্ঞান অর্জন করেছেন হলিউডের ডিজনি স্টুডিওতে গিয়ে। গুপী গাইন বাঘা বাইনের প্রায় ২০ বছর আগে সত্যজিৎ আমেরিকায় সেই ছবি শুটিং দেখেছেন যার প্রধান চরিত্র একটি ধুমসো লোমশ কুকুর, যাকে আমেরিকায় বলে শ্যাগি ডগ,এবং তারা যথেষ্ট ট্রেনিংপ্রাপ্ত। তৎকালীন বাংলার কোনও ট্রেনিংপ্রাপ্ত কুকুর তার ধারে-কাছেও আসতে পারবে না। পরিচালকের হিচকক তার ‘বার্ডস’ ছবির জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন- ‘কয়েকটি শিক্ষিত দাঁড়কাক প্রয়োজন।’ এবং বিজ্ঞাপন বেরোনোর কয়েকদিনের মধ্যেই শ'খানেক শিক্ষিত দাঁড়কাক এসে হাজির। অর্থাৎ স্বীকার করতেই হবে যে হলিউডের মতো সুবিধা আমাদের বাংলায় অথবা তৎকালীন ভারতে বিন্দুমাত্র নেই।পথের পাঁচালীর শুটিংয়ের সময় রাস্তার নেড়ি কুকুর--‘ভুলো’কে দিয়ে শুটিং করানোর সময় ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন সত্যজিৎ। কুকুর বাবাজি তার একগুঁয়েমির জন্য একের পর এক এগারোটা শর্ট পন্ড করে প্রায় হাজার ফুট ফিল্ম খুইয়ে অবশেষে বারো-বারের বার সঠিক শট নিতে সাহায্য করেছেন।সত্যজিৎ লিখছেন..“যারা ছবি দেখছে ,তারা কি জানবে.. যে , দুর্গার পিছন থেকে তার মুঠো করা হাতের ভিতরে রয়েছে সন্দেশ, আর কুকুর চোস্ত অভিনেতার মতো শটের পর শট তার পিছনে হেঁটে চলেছে ওই সন্দেশের লোভেই..”

তখন তো আর এখনকার মত DSLR ক্যামেরা ছিল না, ক্যামেরার মধ্যে ফিল্ম ভরা থাকতো। ফিল্মের দামও ছিল অনেক। তবুও কোন দৃশ্য বাদ না দিয়েই সত্যজিৎ সম্পূর্ণভাবে ছবিটাকে তুলে ধরেছেন। ছবির ক্লাস ধরে রাখবার এই মেন্টালিটি ক্রমাগত আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

যাইহোক,এবার আসি গুপী-বাঘার কথায়। গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমাতে বিখ্যাত দুখানা বাঘের দৃশ্য আছে। এই দৃশ্য শুট হলো কিভাবে?

তখন কলকাতায় “ভারত সার্কাস” এসেছিল। সেই ভারত সার্কাসের থেকেই বাঘ ভাড়া নেওয়া হয়। সেই বাঘের অধিকর্তা মিস্টার থোরাট একটি আইডিয়া দেন। একটা সরু তার ব্যবহার করে, তার একদিক বাঘের গলায় বেঁধে অন্য দিক একটি খুঁটির মধ্যে আটকে দেওয়া হয়। কিন্তু বাঘের গলায় তার জড়ালে গলায় লোম চেপে বসে যাবে তার ফলে এই ফাঁকি ধরা পড়ে যাবে। তাই সত্যজিৎ বাঘের চামড়া দিয়ে একটা বকলস তৈরি করে সেটা বাঘের গলায় বেঁধে শট-টা নেন। পারফেকশনের প্রতি সত্যজিতের এই আগ্রহ সত্যিই মনমুগ্ধকর। কিন্তু বাঁশবনের দৃশ্য প্রিন্ট করে দেখা গেল যে, ক্যামেরার গন্ডগোলে সমস্ত কাজটাই পন্ড হয়ে গেছে সবগুলো বেশি কালো হয়ে যাওয়াতে বাঘ আর বন মিশে একাকার হয়ে গেছে।

তাহলে কি বাঘের দৃশ্য গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবি থেকে বাদ যাবে? নাহ্, স্বাভাবিক ব্যাপার, সত্যজিৎ কোন জায়গায় খুত রাখবেন না, পারলে আফ্রিকায় চলে যাবেন, তবুও ছবির ক্লাস ধরে রাখবার জন্য ওই দৃশ্য করবেনই।

কলকাতায় ভারত সার্কাস তখনও ছিল। আগেরবারের শুটিং হয়েছিল সিউড়ি আর রামপুরহাট এর কাছাকাছি জায়গাতে। এবার কলকাতার কাছেই বোড়াল নামক একটা গ্রামে ভাল বাঁশবনে শুটিং হল। এইখানেই বিশ বছর আগে অপু দুর্গা আর ইন্দির ঠাকুরনকে নিয়ে শুটিং করেছেন সত্যজিৎ আর এবার তার বদলে কাজ করবে গুপি বাঘা আর বাঘমশাই।

হুন্ডি-ঝুন্ডি-শুন্ডি!

সত্যজিতের নিজের কাজের প্রতি ডেডিকেশনের আরেকটা বড় প্রমাণ হলো গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমার ‘হুন্ডি-ঝুন্ডি-শুন্ডি’ এর পার্ট। মাত্র সাড়ে তিন মিনিটের একখানা শর্ট নেওয়ার জন্য সত্যজিৎ রাজস্থান,সিমলা এবং বাংলা... তিনখানা জায়গা ভ্রমণ করেছেন।

যারা সিনেমাটা দেখেছে তারা সকলেই জানে যে প্রথমে গুপী বাঘা শুণ্ডি রাজ্যের নাম মনে করতে পারছিল না। তাই তাদের ভূতপ্রদত্ত জুতোকে ভুল ইনফরমেশন দেওয়ায় সেই জুতো তাদেরকে ভুল জায়গায় নিয়ে চলে যায়। প্রথমবার ‘হুন্ডি’ বলায় বরফের দেশে এবং দ্বিতীয়বার ‘ঝুন্ডি’ বলায় মরুভূমির দেশে পৌঁছায় গুপি এবং বাঘা। এই সামান্য সময়ের শট নিতে প্রথমে সিমলা এবং পরে রাজস্থানে দলবল সমেত হাজির হয়েছেন সত্যজিৎ।সেখানে নিয়ে যেতে হয়েছিল ৮ ফুটের মই। কারণ, হাতে তালি দেওয়ার পরেই গুপি বাঘার শূন্যে উঠে যাওয়ার দৃশ্য তৈরি হয়েছিল.. মই থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সিন-কে রিভার্স করে। 

হাল্লারাজার সেনা:

সোনার কেল্লা শুটিংয়ের সময় উটের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচটা। সুতরাং খুব একটা ঝক্কি ছিল না।
কিন্তু গুপী গাইন বাঘা বাইন এর শুটিংয়ের সময় ব্যাপারটা আর ওইরকম রইল না।
সন্দেশে উপেন্দ্রকিশোরের গুপী গাইন গল্প থেকে ফিল্ম করার জন্য সত্যজিৎ যখন চিত্রনাট্য লিখছেন তখন হা দৃশ্য ভারতবর্ষের কোথায় তোলা হবে তা ঠিক ছিল না। তবে এটা মাথায় ছিল যে হাল্লার সৈন্য হবে অশ্বারোহী। কিন্তু শুটিং প্লেস খুঁজতে খুঁজতে  সত্যজিৎ যখন রাজস্থানে জয়সলমীরের দিকে গেলেন তখন তার মনে হলো যে হাল্লার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর পাওয়া যাবে না। অথচ রাজস্থানের এই অঞ্চলে ঘোড়া নেই আছে উট, তাই
‘অশ্ববাহিনী হয়ে গেল উষ্ট্রবাহিনী।’ হাল্লার সেনার দৃশ্য সম্পূর্ণ সিনেমাতে মাত্র কয়েক মিনিট ছিল ।
কিন্তু সেনাবাহিনীর জন্যই ভাড়া করা হলো এক হাজার লোক এবং এক হাজার উট। বোম্বের একটা সংস্থা থেকে অর্ডার দেওয়া হলো সৈন্যদের জন্য সাজ পোশাক ,মাথার পাগড়ী ,পায়ের নাগরা, ঢাল- তলোয়ার, তলোয়ারের খাপ,বল্লম, পতাকা ইত্যাদি।
জয়সলমিরের রাজার সঙ্গে যোগাযোগ করে হাজার উটের ব্যবস্থা হল সময় মত। শুটিং এর জায়গাটা ছিল একটা প্রাচীন সমাধি ক্ষেত্র।
সব ঠিকঠাকই ছিল কিন্তু শুটিংয়ের দিন আবার ঝামেলা। যিনি সেনাপতি সাজবেন অর্থাৎ জহর রায় আসবেন কলকাতার একটা শুটিং শেষ করে যোধপুর থেকে দেড়শ মাইল ট্যাক্সিতে আসবেন। জয়সলমীর পৌঁছানোর আগেই তিনি গাড়ি এক্সিডেন্ট করে যখম হয়েছেন। যাইহোক আঘাত খুব একটা গুরুতর ছিল না।
এবার উপস্থিত হলো দ্বিতীয় ঝক্কি। সমস্ত উট ঝলমলে পোশাক ,ঝালর বসানো রঙিন জাজিম ইত্যাদি পড়ে চলে এসেছে। সৈন্যদেরও এরকম সুন্দর রঙিন পোশাক পড়ে আসবার কথা। কিন্তু একি! সেনাদের চেহারা এরকম কেন কোথায় গেল সত্যজিতের ডিজাইন করা সেই লাল নীল হলদে পোশাক আর কোথায় গেল সেই বাহারের উষ্ণীষ ? সবাইতো সাদা পোশাক পড়ে বসে আছে । জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে উটওয়ালাদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান,আর তাদের নাকি সাদা ছাড়া অন্য কোন রঙে ঘর আপত্তি আছে, তাই বোম্বাইয়ের তৈরি বাহারে পোশাক দেখে তারা কেউ কেউ হেসেছে, কেউবা বিশ্রী ভাবে ভুরু কুঁচকে মাথা নেড়েছে,কেউ আবার হাতে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।
কিন্তু এক হাজার লোককে একসাথে বোঝানোর কোন উপায় আছে কি? বিশাল এলাকায় অত লোক কেউ কোন কথাই শুনতে পাবে না।
সত্যজিৎ কলকাতা থেকে একটা ব্যাটারি অপারেটর দিয়ে লাউডস্পিকার এনেছিলেন। সেই লাউডস্পিকারের সাহায্যে সত্যজিৎ তার সহকারী তিনু আনন্দের সহায়তায় উটওয়ালাদের কনভিন্স করতে চেষ্টা করলেন। “এখানে তো তোমরা আর সামান্য উটপালক নয়, তোমরা সবাই হলে ফিল্মের অ্যাক্টর। উটের পিঠে চড়ে রঙিন পোশাক পড়ে তোমাদের খুবসুরত দেখাবে, বীর বলে মনে করবে, লোকে দেখে বাহবা দেবে” ইত্যাদি বলে সত্যজিৎ তাদের উৎসাহ দিতে লাগলেন। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হলো না কারণ ততক্ষণে সেই চোঙার ব্যাটারিটা অকেজো হয়ে গেছে।
যাইহোক বেশ কয়েকজনকে দলে ভাগ করে করে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো দু-একজন করে লোক নিজেদের পোশাক ছেড়ে যুদ্ধ সাজ করতেই ক্রমে বাকিরা তাদের দেখাদেখি তৈরি হয়ে নিল। উটকে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করানো হলো ফর্মেশন ঠিক রাখার জন্য সামনের দিকে রাখা হলো মাঝবয়সী আর বুড়োদের। সাড়ে চার মিনিটের গান তোলা হলো গুপি তার সঙ্গে ভালোভাবেই লিপ সিঙ্ক করলো। 
পরের দিন শুটিং হবে মিষ্টির হাঁড়ি নামার। জয়সলমিরে ক্ষীরের মিষ্টির অভাব নেই। শখানেক বড় বড় মাটির হাঁড়ি অর্ডার করে ক্ষীরের মিষ্টি ভরে লাইন করে রাখা হয়েছিল সৈন্যদের সামনে, উটের সারির প্রায় ১০০ গজ দূরে। কলকাতার ল্যাবরেটরীতে ট্রিক ফটোগ্রাফি ব্যবহার করে মিষ্টির হাড়ি নামার দৃশ্য বানানো হয়েছিল।। এরপর সবাই মিষ্টির হাঁড়ির ওপর হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু এখানেও সমস্যা। সৈন্যদের মধ্যে আবার সবাই গোগ্রাসে মিষ্টি গিলতে পারে না। তাই সত্যজিৎ তার অভিনেতাদের মধ্যে যাদের খাইয়ে বলে নাম আছে তাদেরকে একজনকে চটপট মেকাপের সাহায্যে রাজস্থানী গোঁফদাড়ি লাগিয়ে সেনার পোশাক পরে নামিয়ে দিলেন। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি মিষ্টি সাবাড় করেছিল, সে হলো কামু মুখার্জি ওরফে সোনার কেল্লার মন্দার বোস। 

এরপর ‘ফেলুদার সঙ্গে কাশিতে' নামক একটা দীর্ঘ অধ্যায়ে সত্যজিৎ কাশির বিভিন্ন অলিগলি , ঘরভাড়া খোঁজা, কামু মুখোপাধ্যায়ের প্রচন্ড হাস্যরস, সাধারণ মানুষের শুটিং দেখার ভিড় ইত্যাদি বিভিন্ন প্রসঙ্গ বিবৃত করেছেন।

হীরক রাজার দেশে:

হীরক রাজার রাজকোষে সিন্দুক বোঝাই ঘরে সেই হীরের বেশ কিছুটা বার করে আনতে হবে গুপি-বাঘাকে, কারণ পেয়াদাদের ঘুষ দিতে হবে। গানের সাহায্যে পাহারাদারকে বশ করে ভিতরে ঢুকতে পারলেও সিন্দুকের তিনখানা তালার তিনখানা চাবি পাহারা দেওয়ার জন্য বাঘমামা বসে আছেন রাজকোষের ভিতরে ,সেটা তারা জানবে কি করে?

বাঘের এই দৃশ্যের জন্য প্রথমে ‘পায়ে পড়ি বাঘমামা’ গানটার রেকর্ড করা হলো। কিন্তু এরপর যে বাঘটা সিলেক্ট করা হলো, তাকে দেখে নিরাশ হয়ে পড়লেন সত্যজিৎ। এরকম বয়স্ক , জীর্ণশীর্ণ রুগ্ন বাঘ আগে কখনো দেখেননি তিনি। স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু সমাধান মিললো পরের দিনই। মাদ্রাজেই কিছুটা দূরে একটা নধর বাঘের সন্ধান পাওয়া গেল। শুটিংয়ের ডেট উপস্থিত হল। বাঘা (রবি ঘোষ) কে বাঘের খুব কাছাকাছি যেতে হবে, তাই একটা রিস্ক থেকেই যায়। ট্রেনার বললেন, বাঘের নাম মুখে বিড়বিড় করতে করতে কাছে গেলে বাঘ তাকে নিজের পরিচিত বলে ভাববে এবং কোন ক্ষতি করবে না। বাঘের নাম হলো উমা। তখনই প্রথম জানা গেল, সেই বাঘ আসলে মামা নন, মাসি। 

যাইহোক বাঘা রীতিমতো নিজের সাহসের পরিচয় দিয়ে সেদিনকার শুটিং ভালোভাবেই কমপ্লিট করল। সম্পূর্ণ শুটিং এর সময় বাঘ ক্যামেরা সম্পর্কে উদাসীন থাকলেও হঠাৎ শেষের দিকে ক্যামেরার দিকে ফিরে প্রচন্ড চাপড় মেরে থাবা বসানোর চেষ্টা করল। ভাগ্যের জোরেই দামি নিকন ক্যামেরাখানা বেঁচে গেল। 

আমার আঁকা গুপী-বাঘা 
(Concept--internet.)

এর পরের অংশটা বই থেকেই কোট করছি...“দিনের শেষে ‘প্যাক আপ’ বলার পর ট্রেনার তার বাঘকে খাঁচায় পুরে নিয়ে গেলেন।নেওয়া মাত্র শুরু হল বাঘের গগনভেদী হুংকার। একটানা পাঁচ মিনিট ধরে হুংকার দিয়ে তার উপর আমাদের সারাদিনের জুলুমের ঘোর প্রতিবাদ জানিয়ে তবে বাঘ মামা খান্ত হলেন”।










Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

MY FIRST BLOG.

বাংলাদেশের আগুনপাখি